Wednesday, September 16, 2026

ইতিহাসের আরশিনগর | অনন্য নগরীর গল্প কথা


 

পোপ দ্বিতীয় জুলিয়াস সদ্য শুনেছেন ২৯ বছরের এক তরুণ একটি ভাস্কর্য বানিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছে ফ্লোরেন্সের অলিতে গলিতে দূর-দূরান্ত থেকে দলে দলে লোকজন ছুটে আসছে ফ্লোরেন্সের টাউন স্কোয়ার পিয়াজা ডেলা সিনোরিয়াতেশ্বেতশুভ্র মার্বেল পাথরের সেই মূর্তি থেকে যেন ঠিকরে বেরোচ্ছে মানব সভ্যতার সর্বশ্রেষ্ঠ শৈল্পিক দ্যুতি  পোপ ডাকলেন সেই তরুণ ভাস্করকে একমুখ খোঁচা খোঁচা দাড়িনাকটা একটু চ্যাপ্টা আর বেঁকাটে ধরণের দেখতে মোটেও সুশ্রী নন কিন্তু আত্মবিশ্বাসে ভরপুর পড়তে এসেছিলেন ব্যাকরণ কিন্তু তাঁর কৌতূহল হল শিল্পে শোনা যায় ছাত্রাবস্থায় আর এক পড়ুয়ার সাথে বচসার পরসেই পড়ুয়া ঘুষি মেরে তাঁর নাক ভেঙ্গে দিয়েছিলেন নিজে সুশ্রী না হলে কি হবেবা হয়ত সে জন্যইতাঁর সমস্ত ভাস্কর্যরা একেবারে নিখুঁত সুডৌল মুখপেশির আস্ফালন বা প্রতিটি শিরা উপশিরা দৃশ্যমান

যাইহোক পোপের ডাক ফেরাবার সাধ্য কি কারও আছে! তাছাড়া এই পোপ প্রায় মিলিটারি ধাঁচের মানুষ তিনি তাঁর নিজের সমাধি বানানোর জন্য তো বটেই তাকে দিলেন আরও একটি অসাধারণ কাজ সিসটিন চ্যাপেলের এক ঘেয়ে নীল সিলিংকে পরিবর্তন করে অন্যভাবে অন্য কিছু আঁকতে হবে এই কথা শুনে পত্রপাঠ না করে দিলেন তিনি

আমি তো আর চিত্রকর নইআমি হলাম ভাস্করআমি এই কাজটি করতে পারব নাবললেন তিনি

পোপ দ্বিতীয় জুলিয়াসের তাঁর প্রতি অগাধ ভরসানা তুমিই পারবে তাছাড়া এজন্য তুমি ভালই দক্ষিণা পাবে

পোপের নির্দেশ কি আর অমান্য করা যায়! হার মানতে হল তাকে ভাগ্যিস মেনেছিলেন তিনি পরের চার বছর চলল অসীম পরিশ্রম  দিনের পর দিনরাতের পর রাত খাবার জুটছে শুধু পেয়াজ আর রুটি বাবাকে চিঠিতে লিখছেনআমার কোনও বন্ধু নেই এখানে চাইওনা আমি এখানে কাউকে আমার মুখের ওপরে শুধু রঙ ভর্তি তুলি রঙ চুইয়ে চুইয়ে কখনো কখনো মুখের ওপরে পড়ছে দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে আসছে কিন্তু তবু হার মানবেন না তিনি পাঁচশত বর্গ মিটারের বেশি সিলিং জুড়ে তিনি ফুটিয়ে তুলছেন কাহিনী রেখা আর তুলির টানে জীবন্ত হয়ে উঠছে জেনেসিসএর এক একটি গল্প প্রায় কুড়ি মিটার উঁচু সিলিংএ ফ্রেস্কো চিত্রপদ্ধতিতে তিনি নিরলস এঁকে চলছেন প্রতিদিন সকালে চুন বালি আর সিমেন্টের নতুন স্তর তৈরি আর সেটা শুকিয়ে যাওয়ার আগেই তাঁর ওপর রঙের পরত তিনি কখনো দাঁড়িয়েওপরের দিকে তাকিয়েকখনো বা সিলিং থেকে একটু নিচে পাটাতনের ওপর শুয়ে শুয়ে রঙ করে যাচ্ছেন ছবিগুলি মাঝে মাঝেই হাত চলে যাচ্ছে ঘাড়ের পিছনেব্যাথাতে প্রচণ্ড অস্বস্তি হচ্ছে তাঁর

আমরা যারা একটু আধটু ছবি বুঝি বা আঁকি তারা জানি যেকোনো মানুষের ছবিতে আপেক্ষিক অনুপাত কতটা গুরুত্বপূর্ণ কুড়ি মিটার দূর থেকে দেখা কোনও ছবির আপেক্ষিক অনুপাত কাছে থেকে কল্পনা করা কতটা কঠিন তিনি ছবি আঁকছেন তিন ফুট দূর থেকে অথচ তাঁর মাথাতে চলছে কুড়ি মিটার দুরের আপেক্ষিক অনুপাতের মাপজোক তিনি পণ করেছেন এই ছবি হবে কালোত্তীর্ণ চার বছর ধরে চলল অদম্য এক জেদ ১৫১২ সালে যখন জনতার সামনে উন্মোচিত হল এই কাজসবাই দেখল এমন এক অনন্য শিল্প কীর্তি যা এর আগে কেউ কখনো দেখে নি 

তিনি মিকেল এঞ্জেলো  ইতালির নবজাগরণের এক পথিকৃৎ বটবৃক্ষ

সিসটিন চ্যাপেলের মেঝেতে দাঁড়িয়ে সিলিংএর দিকে তাকিয়ে ওই বহু বিখ্যাত ঈশ্বর ও আদমের প্রায় আঙুল ছুঁয়ে যাওয়া দৃশ্য দেখছি অজান্তেই মুখটা হা হয়ে গেছে আমার প্রায় মিনিট দুয়েক হা করে তাকিয়ে আছে সিলিং এর দিকে ইতিহাসের কয়েকটা পাতা বোধহয় এই ঘরের আনাচে কানাচে এদিক থেকে ওদিক হাওয়াতে উড়ে বেড়াচ্ছে  আমার শরীর শিহরিত হয়ে যাচ্ছে আর ভাবছি কি করে পারেন একজন লোক ! পাঁচশ বছর আগের তৈরি এই অসামান্য শিল্পকর্ম কি সত্যিই দেখছি আমি গায়ে একটা চিমটি কেটে দেখব নাকি 

 

     ভ্যাটিকান সিটি  নামের মধ্যে সিটি আছে বলে ভুল বুঝলে চলবে না এটি পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুদ্র একটি দেশ না দেশে কোনও সরকার নেই পার্লামেন্ট নেই বা রাজা নেই কিন্তু পোপ আছেন আর আছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আর সবচেয়ে সুন্দর সেন্ট পিটারস ব্যাসিলিকা আর আছে ভ্যাটিকান মিউজিয়ম পোপের বাগান আর সিসটিন চ্যাপেল আর আছে রঙ বাহারি পোশাক পরিহিত ভ্যাটিকান পুলিশ বাকিংহাম প্যালাসের সামনের গার্ডদের কথা মনে পড়ে যায় এঁদের দেখে

ভ্যাটিকান মিউজিয়ম পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মিউজিয়ম গুলির মধ্যে অন্যতম সম্ভবত ল্যুভর এর পরেই বোধহয় এর নামআমাদের গাইড বললেন, ভ্যাটিকান মিউজিয়মের সবগুলো ঘরের মেঝেকে যদি একের পর এক জুড়ে দেওয়া যায় তাহলে তিনতলা এই বাড়ির পুরো দূরত্ব হবে প্রায় বারো কিলোমিটার সত্যতা কতটা জানি নাতবে বুঝতে পারলাম প্রচুর হাঁটতে হবেভালভাবে দেখতে গেলে একটা পুরোদিনও যথেষ্ট নয় সকালের দিকে টিকিট কাটা হয়েছে এটা ভেবে যেদিন যত গড়াতে থাকবে ভিড় তত বাড়তে থাকবে আমাদের নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টা আগে পৌঁছেও দেখলাম আমাদের আগে কয়েকশ লোক বা হাজারও হতে পারে বুঝিআমাদের আগেই লাইনে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া আছে গেটের বাইরে গার্ড বললেন সঠিক সময়ে ডেকে নেওয়া হবে আপনাদের অগত্যা প্রতীক্ষা করা ছাড়া কোনও উপায় নেই মনে অবশ্য প্রচণ্ড উত্তেজনা আর কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রত্যক্ষ করতে পারব ইতালির নবজাগরণের সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ কিছু শিল্পকর্ম যাদের শুধু এতদিন নামই শুনে এসেছি ইতিহাসের পাতায় আর আর্ট ক্লাসেতাদের অরিজিনাল আর্ট বা ভাস্কর্য দেখব নিজ চোখেলিওনার্দো দ্য ভিঞ্চিমিকেল এঞ্জেলোবত্তিচেল্লিদোনাতেল্লোকারভাজ্জিওরাফায়েলব্রুনোলেস্কিবেলিনিবার্নিনি,টিনটরেটো আর আর কত শত শত শিল্পী

   প্রয়েক শিল্পের পেছনে রয়েছে এক একটি গল্প আমাদের গাইডতাসকানির বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আর্ট নিয়ে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করা মৃদুভাষী ইতালিয়ান সবাই কানে হেডফোন লাগিয়ে ওর গল্পগুলো শুনছি আর অবাক বিস্ময়ে দেখছি বিখ্যাত করিডোর অফ ম্যাপ বা বিভিন্ন কনটেম্পোরারি শিল্পীদের কাজ এক একটা ঘরের একেকটা দেয়াল জুড়ে আঁকা ফ্রেস্কোভাবতেও অবাক লাগে পাঁচ-ছশ বছর আগের আঁকা ছবি গুলো এখন কিরকম জীবন্ত রাফায়েলকে নিয়েই কয়েকটা ঘরকোনটা ছেড়ে কোনটা দেখি এত বড় বড় ছবি ভালভাবে দেখতে গেলে বেলা ফুরিয়ে যায় সেই সাথে প্রত্যেক ছবির নেপথ্য কাহিনী সেগুলোও এতটাই বিস্ময়কর আর রোমহর্ষক শুনে শিহরিত হতে হয় ইচ্ছে হয় সারাদিন এখানেই পড়ে থাকিএভাবেই দেখতে দেখতে একজায়গায় এসে থমকে গেলাম পা সড়ছিল না দ্য স্কুল অফ এথেন্স পুরো একটা দেওয়াল জুড়ে আঁকা অসম্ভব সুন্দর সে চিত্র কে নেই ওখানে একদম মধ্যিখানে অ্যারিস্টটল তাঁর  অনুগামীদের সাথে নিয়ে প্লেটোর সাথে কথা বলছেন আবার ওদিকে সক্রেটিস তাঁর অনুগামীদের সাথে গভীর বিষয়ে আলোচনায় নিমগ্ন  আবার এদিকে নিচে সিঁড়িতে বসে পিথাগোরাস সঙ্গীতের হারমোনিকের অনুপাতের শিক্ষা লিখছেন তাঁর পেছনেই রয়েছে বিখ্যাত গণিতবিদ হাইপেশিয়া পুরো ছবির মধ্যে উনি একমাত্র মহিলা আর একদিকে রয়েছেন ইউক্লিড আর তাঁর ছাত্ররা ইউক্লিডের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন টলেমী রাফায়েল নিজে রয়েছেন এক কোনায় ছবিটিকে পাশাপাশি সমান ভাবে ভাগ করলে বোঝা যায় একদিকে অ্যারিস্টটল আর একদিকে প্লেটোর দার্শনিক মতবাদ একদিকে প্লেটোর আদর্শবাদী দর্শন - যার মুল ভাবধারা হল যে সর্বোত্তম বাস্তবতা পৃথিবীর জড়জগতের মধ্যে কখনই খুঁজে পাওয়া যাবে না এই দর্শন প্রকৃত অর্থেই ভাবধর্মী  আবার অন্যদিকে অ্যারিস্টটলের অভিজ্ঞতাবাদের দর্শন - যার সার কথা হল যুক্তি বিজ্ঞান ও প্রাকৃতিক পরিবেশের দর্শন ছবিতে হঠাৎ করে দেখলে অ্যারিস্টটলকে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি বলে ভুল হতে পারে কিন্তু রাফায়েল ইচ্ছে করেই তাঁকে এঁকেছেন সেভাবেইআর কে না জানে এই যুক্তি বিজ্ঞানের দর্শনের সবচেয়ে বড় প্রতিভূ লিওনার্দো স্বয়ং নিজেই রোমান স্থাপত্যের এই পশ্চাদপটে আঁকা সমস্ত গ্রিক মহারথীদের তিনি মিলিয়েছেন স্থান কাল পাত্রের সীমার ঊর্ধ্বে

 

 

      বর্ষার রাত বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে রাফায়েল স্ট্যাঞ্জা ডে লা সেনাতোরার (Stanza De la Signatura) দেওয়ালে ফ্রেস্কোতে আঁকছেন মানব দর্শনের সম্মিলিত জ্ঞানপিপাসুদের নিয়ে রাফায়েলের ছবি প্রায় শেষ ঠিক তারই ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে একই সময়ে মিকেল এঞ্জেলো সিসটিন চ্যাপেলের সিলিংএ রচনা করছেন মানব সভ্যতার ইতিহাস দি জেনেসিস রাফায়েল শুনলেন সেই রাতে মিকেল এঞ্জেলো থাকবেন না সিসটিন চ্যাপেলে ছবি এঁকে এঁকে ক্লান্ত মিকেল এঞ্জেলো বিশ্রাম নিতে গেছেন উৎসুক রাফায়েল দেখতে চাইছিলেন কি রকম ছবি আঁকা হচ্ছে সিসটিন চ্যাপেলে কিন্তু মিকেল এঞ্জেলো রাফায়েলকে তেমন পছন্দ করছেন না আজকাল ক্রমে ক্রমে রাফায়েলের জনপ্রিয়তা বেড়েই চলছেএটা একদমই পছন্দ নয় মিকেলেরবাদ সাধছিল দুজনের মধ্যেকার পেশাদারি প্রতিযোগিতার

     রাফায়েক দেখলেন এটাই সুযোগ মিকেল এঞ্জেলো নেই সন্তর্পণে তিনি গেলেন পাশের সিসটিন চ্যাপেলে সিলিংএর ছবির বিশালত্ব আর গভীরতা দেখে তাঁর এক পরম উপলব্ধি হল ফিরে এলেন সদ্য শেষ করা ছবি দ্য স্কুল অফ এথেন্সের সামনে কি যেন একটা বাদ পড়েছে রাফায়েল আঁকলেন হেরোক্লাইটিসকে  সবার থেকে একটু একা একটা মার্বেল পাথরের সামনে লিখছেন তাঁর পরনের কাপড়টা একটু আলাদা সবার থেকে পায়ে ভারি বুট অনেকটা সমকালীন ভাস্করদের পায়ের বুটের মত দেখতেও মিকেল এঞ্জেলোর সঙ্গে প্রবল সাদৃশ্য রাফায়েলের প্রাথমিক ড্রয়িং আর এই শেষ করা ছবিতেও মিকেল এঞ্জেলোর মত দেখতে হেরোক্লাইটিস ছিলেন না কিন্তু সিসটিন চ্যাপেলের ফ্রেস্কো দেখার পর রাফায়েল স্থির করেন যে তাঁর মিকেল এঞ্জেলোই হবেন সেই জন যিনি এই দুই দর্শনবাদকে মেলাবেন একজন সমসাময়িক শিল্পীর প্রতি আর একজন শিল্পীর এতবড় উৎসর্গ আগে কখনো দেখা যায় নি

     আমি মনে মনে কল্পনা করার চেষ্টা করছি - সর্বকালের সেরা দুই শিল্পী রাফায়েল আর মিকেল এঞ্জেলো যারা নিজেদের একে অপরের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করছেনতাঁরা  দুজনেই ঠিক একই সময়ে একবারে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে রচনা করে চলেছেন দুই সর্বকালের সেরা শিল্পকর্ম ভাবতেই শরীরের রোম খাঁড়া হয়ে উঠলো একে নবজাগরণ বলব না তো কি বলব ?

 

 

      ইন্টারনেট ঘেঁটে কোথাও ফ্রিতে টম হাঙ্কসের এঞ্জেলস অ্যান্ড ডেমন্স সিনেমাটা খুঁজে পাচ্ছিলাম না অতএব কি আর করা,প্রাইম ভিডিওতে কিনেই ফেললাম সিনেমাটা শেষমেশ ডান ব্রাউনের বিখ্যাত ট্রিলজি - দ্য  ভিঞ্চি কোডএঞ্জেলস অ্যান্ড ডেমন্স আর ইনফারনো বহুদিন থেকে রোমের পরিকল্পনা চলছে ভাবলাম এই সুযোগে ছেলেমেয়েদের সিনেমাটা দেখিয়ে রাখি যদিও এটা একটা ফিকশনকিন্তু এই ঐতিহাসিক বা পৌরাণিক ফিকশন এর পটভূমি যে রোমের একটা অংশ সেটা দেখে ওদের নিশ্চয় বেশ মজাই হবে

     রোমে পৌঁছে আমাদের এয়ার বিএনবিতে ব্যাগপত্র রেখে সবার প্রথমেই যেখানে যাই সেটা  ছিল পিয়াজা নভোনা একটু হাঁটা পথ ততক্ষণে আমাদের সবার জানা হয়ে গিয়েছে পিয়াজা নভোনাতে যে ফোয়ারাটা আছে - ফন্টানা ডে কোয়াত্র ফিউমি যার বাংলা করলে দাঁড়ায় চার নদীর জল সেখানেই এঞ্জেলস অ্যান্ড ডেমন্স এর একজন কার্ডিনালকে জলে ডুবিয়ে মারার চেষ্টা করা হয়েছিল যেটা জানতাম না সেটা হল ওই চার নদীর জলের মধ্যে একটি হল আমাদের গঙ্গা বেশ মজা লাগল জেনেবারনিনির এই অতি বিখ্যাত ভাস্কর্য একেবারে পাবলিক স্কোয়ারে এরকম ভাবে হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন দেখছে এটাই রোমের বিশেষত্ব রোমের প্রতিটি অলিতে গলিতেপাথরের রাস্তায়প্রতিটি ইটে ইতিহাসের গল্প লুকিয়ে আছে একটা শহরে যে এত ঐতিহাসিক নিদর্শন থাকতে পারে সেটা রোমে না এলে কখনও বিশ্বাস হত না

      এই যেমন পান্থেওন

      পিয়াজা নভোনার অনতিদূরে দশমিনিট হেঁটে গেলেই পান্থেওন দুহাজার বছরেরও আগের তৈরি এই মন্দির মানব সভ্যতার এক বিরল বিস্ময় রোমান স্থাপত্যের নাম যে কেন বিশ্বজোড়া তারই এক দারুণ উদাহরণ আজও স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে এর আগে পৃথিবীতে কেউ কোথাও এমন স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন তৈরি করতে পারে নি প্রকৌশলীর চূড়ান্ত মিনার যেনপান্থেওনের ভিতরে ঢোকবার লাইনটা বেশ বড় পৃথিবীর সব দেশের লোক হাজির হয়েছেন সেখানে বিকেলের রোদ মাথায় নিয়ে দাঁড়াতে আমাদের একটু অসুবিধে হলেও কারও মনে কোন অভিযোগ নেই পান্থেওনের ঢোকার মুখে বিশাল উঁচু সব স্তম্ভগুলো দুহাজারেরও বেশি সময় ধরে একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে এক একটা স্তম্ভ প্রায় চারতলা বাড়ির সমান উঁচু মানুষদের তার নিচে লিলিপুটের মত লাগছিল ভাবতে অবাক লাগে এই এক একটি স্তম্ভ তৈরি হয়েছে এক প্রস্তরে এবং সেসব প্রস্তর নিয়ে আসা হয়েছিল হাজার মাইল দূরে মিশর থেকেযার এক একটির ওজন একটা এয়ারবাস A320 ওজনের সমান ভাবতে আরও অবাক লাগে মিশর থেকে নিয়ে আসা এরকম প্রস্তরকে সুচারুভাবে নিখুঁত স্তম্ভ বানিয়ে কিভাবে সেগুলো দাঁড় করান হয়েছিল যা আজ ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে প্রাকৃতিক বিপর্যয়দুর্যোগভূমিকম্প উপেক্ষা করে আজও একেবারে ওভাবেই দাঁড়িয়ে আছে

       পিলার পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকতেই অপেক্ষা করছিল আর এক বিস্ময় ৮২ মিটার ব্যাসের পূর্ণ গোলকের আদলে তৈরি এর সিলিং সবথেকে বড় কথা এতবড় সিলিং ধরে রাখার জন্য নেই কোন অবলম্বন বা পিলার রোমান স্থাপত্যশৈলীর এক অবাক বিস্ময় এই পান্থেওন সারা পৃথিবী এক বাক্যে স্বীকার করে নিল মানবজাতির ইতিহাসে রোমানদের থেকে সর্বোৎকৃষ্ট স্থাপত্য আর কেউ তৈরি করতে পারে নি বা তার ধারে কাছেও যায় নি আজও পান্থেওনের নির্মাণশৈলী মানুষের গবেষণার বিষয় পান্থেওন তৈরির মধ্যে দিয়ে রোমানরা আবিষ্কার করেছিল এক নতুন ধরনের কংক্রিট

       ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখি সিলিংএর ঠিক মাঝখানে বেশ বড় একটি বৃত্তাকার ফুটো  অকুলাস। ৯ মিটার ব্যাসার্ধের এই ফুটোর মধ্যে দিয়ে সূর্যের আলো এসে পুরো গর্ভগৃহকে  আলোকিত করে তোলে আর সূর্যের প্রদক্ষিণের সাথে সাথে সূর্যের আলো এই পূর্ণ গোলকের মধ্যেও প্রদক্ষিণ করতে থাকে যেন এক পৃথিবীর মধ্যে আর এক পৃথিবী পান্থেওন সব ধর্মের সব বর্ণের মানুষকে জায়গা করে দিয়েছে নিজের মধ্যে যদিও সেখানে খ্রিস্টান ধর্মের প্রার্থনা হয় সময় মেনেকিন্তু সেখানে সবার অবারিত দ্বার এখানে শুধুই মানবজাতির জয় জয়াকার ভরসা আর বিশ্বাসের জায়গা একটা অপার্থিব অনুভূতিআমাদের মন প্রাণ সব পূর্ণ

       সারা রাত প্লেন এ চেপে সকালে রোমে পৌঁছেছি প্লেন এ ভাল ঘুম তো হয়ইনিতার ওপর আবার স্থানীয় সময়ের পার্থক্যজেট ল্যাগ বিকেল এখন পড়ন্ত সিয়াটেলে বুঝি বা মাঝ রাত সারাদিন হেঁটে হেঁটে আমরা সবাই ক্লান্ত ঘুম পাচ্ছে আমাদের সবার পান্থেওনের ভেতরেই একটা ফাঁকা চেয়ার পেয়ে আমরা বসে পরলাম সবাই চোখ বুজে আসছে একটা প্রশান্তি মুখ জুড়ে  পাশেই শায়িত সর্বকালের সেরা শিল্পী রাফায়েল অন্তিম ঘুমে বিভোর তিনিও ইতিহাস যেন জীবন্ত হয়ে উঠছে স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিহাজার হাজার রোমানরা মিশর থেকে জাহাজে করে নিয়ে আসা ওই প্রস্তর বয়ে নিয়ে আসছে টাইবার নদীর ধার ধরে চারিদিকে প্রচণ্ড কোলাহল সবাই হাতে হাত লাগাচ্ছে

       আকাশের রঙ গাঢ় লাল এইবার সূর্যাস্ত হবে আমরা এবারে যাব টেরেজা ডেল পিনচিওতে সেন্ট পিটারস ব্যাসিলিকা আর রাতের রহস্যময়ী রোমকে দেখব ওখান থেকে

 

 

মাক্সিমাস ডেসিমাস মেরিডিয়াসকে  লোকে চেনে স্পানিয়ারড নামে মাঝে মাঝে মাক্সিমাসের মনে হয় এই গ্ল্যাডিয়েটরের জীবন খুব একঘেয়ে হেরে গেলে যেখানে মৃত্যু অনিবার্য এরকম খেলাতে একদম মন নেই তার কিন্তু কি আর করা যাবে মাঝে মাঝে আগের কথা মনে হয় তার রোমান সেনাপতির কাজ ছিল এক বীরের মত বীরের কাজ একলা শুয়ে তারা ভরা রাতের দিকে তাকিয়ে মাক্সিমাস ভাবছে আগামী  কালকের খেলাতে কী হতে যাচ্ছে কখনও ক্ষুধার্ত হিংস্র বাঘ বা সিংহের সাথে মরণপণ খেলায় কখনও বা অন্য গ্ল্যাডিয়েটরের সাথে যুদ্ধে গ্যালারি ভর্তি ষাটহাজার জনতাকে আনন্দ দিতে আর ভাল লাগছে না তার কাল রাতে লুসিলা গোপনে দেখা করে গেছে তার সাথে লুসিলা মনে মনে অভিসন্ধি করছে তার ভাই সম্রাট কমোডাসকে সিংহাসনচ্যুত করবেন এজন্য তার দরকার মাক্সিমাস এর সাহায্য তুমি একবার সেনেটর গ্রাচুসের সাথে দেখা করোপ্রস্তাব দেয় লুসিলা মাক্সিমাসের মনে সন্দেহ হয় ব্যাপারটা ভাল ঠেকছে না রাজি হয় না সে

       কাল বড় খেলা রোমের সব লোক এসে কানায় কানায় ভরে তুলবে কলোসিয়াম সম্রাট কমোডাসও থাকবেন বাকি আশি হাজার আমজনতার সাথে বীরের উল্লাস আর জয়ধ্বনিতে ফিকে হয়ে যাবে পরাজিতের আর্তনাদ

       মাক্সিমাস উঠে এলেন একা একা সবার অলক্ষ্যে এলেন কলোসিয়ামের মুল ময়দানে মনে মনে ভাবছেন কালকের খেলার পরিণাম যেন মৃত্যু না হয় এ এক অসহনীয় পরিণাম গলের টাইগ্রিস এর সাথে যুদ্ধ নিচু হয়ে মাটি ছুঁলেন মাক্সিমাস কত কত রক্ত লেগে আছে এই মাটিতে তার যেন অন্যথা হয় কাল এই মাটি যেন রক্তে রাঙা না হয়

       সাতসকালে পৌঁছে গেছি কলোসিয়ামে পুরনো রোমের পাথরের রাস্তায় আস্তে আস্তে দিনের আলো ফুটতে শুরু করেছেএখনও পরিযাত্রিরা চারিদিকে এসে পৌঁছননি রাস্তাঘাট শুনশান সকালে এক অদ্ভূত শান্ত স্থিরতা আস্তে আস্তে পা বাড়ালাম কলোসিয়ামের রঙ্গভূমির দিকে এই পথ দিয়েই হেঁটে গেছেন মাক্সিমাস এই পথ দিয়েই হেঁটে গেছেন গ্ল্যাডিয়েটররা দুহাজার বছর আগে ওপরে তাকিয়ে চারিদিক দেখছি ওইতো ওখানেই বসেছিলেন সম্রাট কমোডাস আর অদিকে ওখানে সব সেনেটররা সম্রাটের পাশে সম্রাজ্ঞী এর নিচে ভুলভুলাইয়া দিয়ে আনা হত ক্ষুধার্ত সব হিংস্র জন্তু জানোয়ারদের গমগম করে উঠত পুরো রঙ্গভূমি চলত ব্যাবসা বাণিজ্য দুহাজার বছরের কলোসিয়ামের একেবারে মধ্যে ধুকে গিয়ে নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সাত আশ্চর্যের এক আশ্চর্য হল এই কলোসিয়াম এক বিশালতা বাইরে থেকে বোঝবার উপায় নেই শুধু কলোসিয়ামে যাওয়ার জন্যই রোমে যাওয়া যায়

       আস্তে আস্তে ভিড় বাড়তে শুরু করেছে আমাদের সরে যেতে হবে অন্যদের জন্য এই বিশালতা এই অনুভূতি বলে বা লিখে বোঝানো যাবে না ভারাক্রান্ত মনে বেরিয়ে আসছি কলোসিয়ামের বাইরে আসলে মাক্সিমাস বলে কেউ ছিল না ইতিহাসে কিন্তু মাক্সিমাস আমাদের সবার মনের অলিন্দে ঘোরাফেরা করে এই মাক্সিমাস একজন যুদ্ধজয়ী সেনানায়ক নয়এই মাক্সিমাস বিজয়ী গ্ল্যাডিয়েটর হয়েও প্রতিপক্ষের প্রাণ নেন নাজীবনের জয়গান উদযাপন করেন

       কলোসিয়াম থেকে বেরিয়ে আসছি একটু পা চালিয়ে আমাদের পরের গন্তব্য রোমান ফোরাম হঠাৎ পিছন থেকে একজন ডেকে উঠলেনও দাদাআপনি কি কলকাতার 

       বাংলা কথা শুনে চমকে উঠলাম ফজলুর রহমান মণি বগুড়াতে বাসা বহুদিন আছেন রোমে সুভেনির বিক্রি করেনদেশ ছেড়েছেন অনেকদিন ছেলে এখানেই কলেজে পড়ে  বড় হয়ে ডাক্তার হতে চায় বাংলাতে গল্প হল কিচ্ছুক্ষণ ক্লাস এইটের ইতিহাস বইয়ে পরা কলোসিয়ামের সামনে দু বাঙালি গল্প জুড়ে দিল অনেক কথায় আছে সব রাস্তা গিয়ে মেশে রোমেআমার মনে হচ্ছিলদুই বাংলার দুই ভাই আমরা দু রাস্তা ধরে এসেও মিলে গেলাম সেই রোমেই

 

                                      —————————— ০ ————————— 

 

 

 

0 comments: