এখানে বৃষ্টি পড়ে বারোমাস, এখানে ভালবাসা রডোড্রেনড্রন গুচ্ছ, এখানে কুয়াশা এক ছন্নছাড়া মেঘ, এখানে পাইনের হাতছানি, আর সব তুচ্ছ - সিয়াটেলের বেশ বদনাম রয়েছে এ জন্য যে সিয়াটেল বৃষ্টির শহর। গ্রীষ্মকাল চলে গেলেই শুরু হয়ে যায় বৃষ্টির আনাগোনা। চলে পরের গ্রীষ্ম অব্ধি। বৃষ্টি ভালবাসি বলেই বোধহয়, সিয়াটেল আমার এত প্রিয় শহর। আমার কর্মভূমি। আসলে ব্যাপারটা বোধহয় অতটা লঘু করে দেখলে হবে না। আমি উত্তরবঙ্গের ছেলে। বড় হয়েছি পাহাড়ের প্রচ্ছন্ন আদরে, মেঘ আর বৃষ্টির সাথে খুনসুটি করে। কি জানি, মনে মনে আমি বোধহয় ওই ফেলে আসা ছেলেবেলা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করি এখানেই। আর সেজন্যই বোধহয় এই শহর এত প্রিয়।
আমেরিকার উত্তর পশ্চিম প্রান্তের এই রাজ্যে বিশ্ববিধাতা বোধহয় একটু বেশিই পক্ষপাতিত্ব করে ফেলেছেন। প্রকৃতি যেন দুহাত উজাড় করে সব ঢেলে দিয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরের এই উপকুলে। এখান থেকে আধঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে গেলেই একেবারে সোজা পাহাড়ের কোলে । পথের পাশে নাম না জানা ঝর্না, কুলকুল করে বয়ে যাওয়া চঞ্চল তন্বী পাথুরে নদী। ওপর দিয়ে একটা রেল ব্রিজ। মনে হয় যেন কোথাও আগে দেখেছি এরকম জায়গা। হাসিমারা থেকে সেবক হয়ে এনজেপি যাওয়ার ট্রেন রাস্তাটা ঠিক এরকম না! পাশে পাহাড়ের কোলে মেঘ খেলে বেড়াচ্ছে। প্রকৃতির মন ভার। আমি এখানে উত্তরবঙ্গের ছোঁয়া পাই খুব। বৃষ্টি দেখতে গেলে ড্রাইভ করে চলে যাই কাছে পিঠে কোথাও। মনখারাপ লাগলে, বাড়ির জন্য মন কেমন করলেও ছুটে যাই ওই পাহাড় থেকে নেমে আসা ছোট্ট পাথুরে নদীর কাছে। দুদণ্ড আলাপ করি নিজের সাথে। বয়ে যাওয়া নদীর জলের সাথে। আমি চলে যাই উত্তরবঙ্গের ছেলেবেলায়। ফি বছর শীতকাল পড়লেই যেমন ছুটে যেতাম ডুয়ারস এ। কালীখোলা, কালিঝোরা, ভুটানঘাট, দলসিংপাড়া জয়ন্তী বা ফুন্টশেলিং । নদীর ধারে রান্না হত, ওখানেই পাত পেড়ে খাওয়া। কেউ বা যেত কাছে পিঠে কোথাও কমলা বাগানে। এখানে কমলালেবু হয় না। কিন্তু ওয়াশিংটনের আপেল জগৎ বিখ্যাত। বাড়িতে একটা গাছ লাগিয়েছি বছর পাঁচেক হল। প্রতিবছর আপেলের ভারে গাছের ডাল মাটিতে নুইয়ে পড়ে। বাড়ি থেকে নিয়ে আসা বিরিয়ানি দিয়ে পিকনিক হয় সপরিবারে। সিয়াটেল তাই আমার কাছে যেন আমার শৈশবে ফিরে যাওয়া।
আমার বাড়ি কোচবিহারের দিনহাটায়। প্রান্তিক এই শহরে বড় হয়েছি ছোটবেলা থেকে আর পাঁচটা উত্তরবঙ্গীয় ছেলের মতই। পড়াশোনা করার থেকে খেলাধুলোতে মন থাকত বেশি। মাধ্যমিক পরীক্ষার পর বাবার হাত ধরে চলে এসেছিলাম কলকাতায়। রামকৃষ্ণ মিশনে পড়বো বলে। মনে আছে সে বছর উত্তরবঙ্গে বন্যা হয়েছিল ভয়ঙ্কর। তিস্তা, তোরসা, কালজানি, ধরলা, মহানন্দা , জলঢাকা সব নদীর জলই বিপদসীমার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল। টানা দশদিন ধরে অবিরাম বৃষ্টি । ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের দুপাশের ধান খেত, পাট খেত সব জলমগ্ন। মনে হয়েছিল যেন কুলহীন এক নদী পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে বয়ে চলেছে।
সেই যে বের হয়েছিলাম বাড়ি থেকে, ফেরা আর হল না। কলকাতা থেকে হায়দরাবাদ, সেখান থেকে ব্যাঙ্গালোর, প্যারিস, লন্ডন ঘুরে হাজির হলাম অতলান্তিক পেরিয়ে সুদূর আমেরিকায়। ব্যাঙ্গালোরের বাড়ি ঘর ছেড়ে আক্ষরিক অর্থেই একটা সুটকেস হাতে নিয়ে দু বছরের কন্যা আর সহধর্মিণীকে নিয়ে পৌঁছে গেলাম অ্যারিজোনার ফিনিক্স শহরে। কিন্তু এ কেমন শহর ! শুনেছি আমেরিকা স্বপ্নের দেশ। সম্ভাবনার দেশ। আমাদের মননে আমেরিকার যে ছবিটা আমরা সযত্নে লালন করি এ শহর সেরকম নয় তো। ছোট ছোট বাড়ি, গাছপালা নেই বললেই চলে, মাঝে মাঝে বড় বড় ক্যাকটাস আর গুল্ম জাতীয় কিছু গাছ। রুক্ষ মরুভূমির জায়গা। বড় বড় রাস্তা আর সেখানে হু হু গতিতে চলে যাচ্ছে কত কত গাড়ি। কিন্তু লোকজন দেখি না তেমন কোথাও। ভারতীয় দোকান নেই বললেই চলে। একটা এশিয়ান দোকানের একটা তাকে তেল নুন মশলাপাতি আর চাল পাওয়া যেত। শুরু হল আবার নতুন করে সব কিছু। মেয়ের স্কুল, আমার অফিস এসব নিয়ে মানিয়ে নিচ্ছিলাম আস্তে আস্তে। দু একজন বাঙালির সাথে বন্ধুত্ব হল। দেখা হলেই আমরা দুঃখ করি দেশের শাক সবজি খেতে পাই না, ছোট মাছ খাইনা কত দিন। বোরোলী, পুঁটি, ট্যাংরা পাবদা কবে খেয়েছিলাম ভুলে গেছি। সবে গুছিয়ে নিতে শুরু করেছি, ডাক পড়ল পূর্ব উপকুলে। আবার সেই ছিন্নমূল জীবন। এসে পড়লাম কানেটিকটে। সেবারের দুর্গাপুজোয় একসঙ্গে দেখলাম এত বাঙালি। সবাই খুব আন্তরিক। সপ্তাহান্তে দুর্গাপুজো হয় এখানে।
দিনহাটায় আমাদের বাড়ির সামনেই একটা দুর্গাপুজো হয়। ছোটবেলা থেকে ওই দুর্গাপুজো আমার জীবনের একটা অংশ। তখন এলপি রেকর্ড এ কিশোর কুমার এর কণ্ঠে বাজত, আমার পূজার ফুল, আর লতা মঙ্গেসকরের গলায়, আর নয় গুনগুন গুঞ্জন প্রেমের। নবমীর দিন রাতে বৃষ্টি যেন হবেই। বড়রা বলতেন মা চলে যাচ্ছেন, তাই প্রকৃতি কাঁদছেন। এখানে পুজোর সময়টা হেমন্তকাল । পাতা রঙিন হবার সময়। পাতাঝরার দিনও বটে।
পরে বুঝেছি আমেরিকা প্রকৃতিগত ভাবে কতটা বৈচিত্র্যময়। এখানে প্রত্যেকটা মরশুম বোঝা যায় খুব সহজেই। পাতাঝরার মরশুম বা বসন্ত জাগ্রত দ্বারে। কানেটিকট ছেড়ে সিয়াটেলে যখন এলাম সবাই বলছিল, আরে যাস না, ওখানে শুধু বৃষ্টি আর বৃষ্টি। কিন্তু তারা তো জানে না ওই পাইনের মাথায় লেগে থাকা মেঘ, টুপ টুপ করে ঝরে পরা বৃষ্টির ফোঁটা গাছের পাতা বেয়ে, বা ওই যে পাশ দিয়ে বয়ে চলা চঞ্চল পাথুরে নদী, এগুলোই তো আমার সারা জীবনের পাথেয়। আমার নিজের একটুকরো উত্তরবঙ্গ।

0 comments:
Post a Comment