Monday, April 20, 2026

রবীন্দ্রনাথ ও আমি


রবীন্দ্রনাথের সাথে আমাদের সবার পরিচয় সেই ছোটবেলাতে। যখন প্রথম পড়তে শিখি। ছোট খোকা বলে অ আ দিয়ে শুরু । তখন জানতাম না, ওই সহজ পাঠের দুটো ভাগ তাঁরই লেখা। অনেক পরে বড় হয়ে বুঝেছি ওই দুটো বই আমাদের জীবনে কত বড় প্রভাব ফেলেছিল। আমরা যারা বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করেছি, তাদের সবার জীবনের প্রাথমিক ভিত তৈরি হয়েছিল ওই দুটো বইয়ের হাত ধরেই। আজ মঙ্গলবার, পাড়ার জঙ্গল সাফ করার দিন। সরল মনে মেনে নিয়েছিলাম সপ্তাহে শুধু মঙ্গলবার ই বুঝি ধার্য থাকে জঙ্গল পরিষ্কার করার জন্য। আমাদের স্থানীয় ক্লাব, রবীন্দ্র বিকাশ সঙ্ঘ - রবীন্দ্রনাথের নামেই নামাঙ্কিত- থেকে আয়োজন করা হত পাড়ার আবর্জনা সাফ করার পর্ব। মঙ্গলবার করেই। অনেক পরে বড় হয়ে বুঝেছি কী অবলীলায় খেলাচ্ছলে রবীন্দ্রনাথ শিখিয়ে গেছেন যুক্তাক্ষরের সহজ পাঠ। আমরা কোনদিন কোন জিজ্ঞাসা না করেই আনন্দভরে পড়ে গেছি সহজ পাঠ। আর আমাদের বড় হওয়ার প্রতিটি মুহূর্তকে আস্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছে বই দুখানি।
রবীন্দ্রনাথের সাথে পরিচয় তারও অনেক আগে। অজান্তেই । মায়ের হাত ধরে।মাকে বহুবার গুনগুন করে গাইতে শুনেছি, আমার সকল দুঃখের প্রদীপ/ জ্বেলে দিবস গেলে করব নিবেদন। আমার ব্যাথার পূজা হয়নি সমাপন। খালি গলায় গাইতেন। এতটা দরদ দিয়ে গাইতে শুনিনি কোনদিন কাউকে। বহুবার দেখেছি মায়ের গাল গড়িয়ে চোখের জল পড়তে, এই গানটি গাইবার সময়। আমার ভীষণ রাগ হত তখন। এরকম গান গাওয়ার দরকারই বা কি? যেটা গাইতে গাইয়ে চোখের জল ফেলতে হয়। মনে মনে রাগ পুষে রাখতাম তাঁর জন্য যে এরকম একটা গান লিখেছেন।
সন্ধ্যেবেলায় বাড়িতে হ্যারিকেনের নিবু নিবু আলোতে মা বই পরতেন বা বুধবারের বাংলা নাটক শুনতেন আকাশবাণীতে। আমি তখন ছোট। বাবা বাজারে থাকতেন। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে ব্যস্ত। বাড়িতে দুটো প্রাণী বলতে আমি আর মা। নাটক শোনার আগে রেডিওতে সাঁওতাল ভাষার একটা অনুষ্ঠান হত। আর তারপর নাটক। ওই অনুষ্ঠান শুরু হলেই অপেক্ষায় থাকতাম কখন নাটক শুরু হবে। ওই সময়কার ভীরু ভীরু সন্ধ্যেগুলোতে বাড়িতে যখন আমি আর মা ছাড়া কেউ নেই, ওই সময়টা ছিল আমাদের একান্ত ব্যক্তিগত অনুভব বিনিময়ের সময়। তুচ্ছ কিছু আনন্দ, দুঃখ , সুখ। আমার সকল দুঃখের প্রদীপ এর আমি একমাত্র শ্রোতা। কোনদিন ভাগ করে নিতে হয়নি অন্য কারো সাথে।
অনেক পরে বড় হয়ে বুঝেছি, আমাদের সবার, প্রত্যেকের জীবনে এমন কোন অনুভব নেই যা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ গান লেখেননি। আমাদের সবার একত্রিত অনুভব কীভাবে একটা লোক জেনে গেল এবং আজও তার কোন ব্যাতয় হয় না, এইটা ভেবেই খুব অবাক লাগে। আমার সকল দুঃখের প্রদীপের আমার কাছে একটা স্বপ্নের মত। এটা সবার থেকে আলাদা, কারও সাথে ভাগ করে নেবার নয়।
আরও ছোটবেলায় একবার মার হাত ধরে মামার বাড়ি গিয়েছিলাম। প্রত্যন্ত গ্রামে। মামার বাড়ির চারপাশে আরও কয়েকটা বাড়ি আর তার পাশেই চাষের জমি। এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত সবুজ মাঠ। শীতকালে জমির আল ধরে হেঁটে গেছি, পায়ে লেগে আছে সারারাতের পড়ে থাকা হিম। মামার বাড়ির পাশেই ইরিগেশন বিভাগের একটা চৌবাচ্চা ছিল। সেখানে খুব জোরে জল আসত মেশিনকল থেকে। সেখান থেকে জল বণ্টন করা হত আশে পাশের ক্ষেতগুলোতে। সর্ষে ফুলে ভরে থাকত ক্ষেতগুলো। কোনটাতে ফুলকপি, কোথাও বা বেগুন, কোথাও বা পালং শাক। মামার বাড়ির কাছাকাছি ছিল আমাদের একটা পাড়াতুতো মাসির বাড়ি। মায়ের বান্ধবী। মা, মামার বাড়ি গেলেই দেখা করতে যেত বান্ধবীর সাথে। কাঠের বাড়ি। কাঠের উঁচু মেঝে, কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হত। নিকনো উঠোনের এক কোনায় তুলসী পাট। শীতের এক সকালে মায়ের হাত ধরে গেছি ওই মাসির বাড়িতে। দূর থেকে শুনতে পেলাম বাড়ি থেকে হারমোনিয়ামে গান ভেসে আসছে, খোল খোল দ্বার, রাখিয়োনা আর বাহিরে আমায় দাঁড়ায়ে। আরে এত আমারই কথা। যদিও তখনও আমরা বাড়িতে ঢুকিনি। প্রত্যন্ত গ্রামে যেখানে বাস থেকে নেমে কখনও কখনও হেঁটে বা কখনও গোরুরগাড়িতে চেপে যেতে হয়, যেখানে দু বেলা যারা নিজেদের চাষের ফসলে দুমুঠো খেয়ে দিন পার করে দেয়, সারা বিশ্বে কি হল বা না হল তাতে কিছু যায় আসে না, সন্ধ্যের পর বট পাকুড় এর তলা দিয়ে হাটে যাওয়া বারণ রবীন্দ্রনাথ তাঁদেরও হেঁশেলে, শয়নে স্বপনে জাগরণে। আজও যখন আমি খোল খোল দ্বার শুনি,আমি ফিরে যাই আমার শৈশবে। ওই আলপথ। ফুলকপির ক্ষেত। ঘাসের ওপর পড়ে থেকে সারারাতের হিম। আচ্ছন্ন করে দেয় মন।
আমাদের গ্রামের বাড়ির পাশে একটা বেসিক ট্রেনিং কলেজ আছে। ওই কলেজর যে বুনিয়াদি প্রাইমারি স্কুল আছে সেখানেই আমরা পড়াশোনা করেছি। আমাদের সময় ওই কলেজ ছিল খ্যাতির শীর্ষে। প্রতি বছর একশোর বেশি হবু শিক্ষক ও শিক্ষিকারা আসতেন আবাসিক এই কলেজ এ শিক্ষা নিতে। সবথেকে সংস্কৃতিমনস্ক অধ্যাপক যিনি ছিলেন তাঁর নাম সুনীতি বিশ্বাস। আবাসিকদের সকলের বড়দি। আমাদের ছোটদের কাছে বড়পিসি। বিয়ে করেননি কোনদিন। পুরো জীবন দিয়ে গেছেন শিক্ষায় আর সংস্কৃতিতে। মূলত তাঁরই উদ্যোগে হত বছর জুড়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কবিতা আবৃত্তি, গান,নাটক, নাচ, গীতিনাট্য, রবীন্দ্রজয়ন্তী সব হত তাঁর নিজের হাতে সযত্নে সাজিয়ে। আমরা খুদেরা আগ্রহ ভরে অংশ নিতাম সেসব অনুষ্ঠানে। স্টেজে দাঁড়িয়ে একবার দুবার তো ভুলেও গেছি দু একটা কবিতার লাইন। বসন্ত উৎসবে যখন দোল খেলা হত বড়পিসি আবিরের সাথে মিশিয়ে দিতেন গাঁদাফুলের পাপড়ি। এখনও মনে পড়ে । বসন্ত উৎসবেই দেখি দুই খুদেকে, ওরে গৃহবাসী, খোল দ্বার খোল গানে রবীন্দ্রনৃত্য করতে। লাল পেড়ে শাড়ি, হাতে গলায় শাদা কাগজের ফুল, একেবারে ঠিক পরীর মত লাগছিল ওদের। সেই প্রথম ভাললাগা। ইচ্ছে হচ্ছিল সামনে গিয়ে কথা বলি। সাহস হয়নি কখনও। দুজনেই গান হয়ে রয়ে গেছে স্মৃতিতে।
দীপঙ্কর মহারাজের গলায় প্রথম শুনি দাঁড়িয়ে আছো তুমি আমার গানের ওপারে। মহারাজের দরাজ উদাত্ত গলায় প্রথমবার শুনেই মোহিত হয়ে গিয়েছিলাম। পরবর্তীকালে রেকর্ডিংও করেছিলাম গানটা। আমি তখন ইলেভেনে পড়ি। রবীন্দ্রনাথ অনেকটাই গ্রাস করে নিয়েছেন আমায় ততদিনে। জীবন সম্পর্কে অনেক কৌতূহল, অনেক প্রশ্ন। নিষিদ্ধের হাতছানি। বখে যেতে পারিনি। দাঁড়িয়ে আছেন তিনি আজও আমার গানের ওপারে।
------------------------------------------------------ 0 -----------------------------------------------------


0 comments: