Monday, April 20, 2026

এক টুকরো উত্তরবঙ্গ

 এখানে বৃষ্টি পড়ে বারোমাস, এখানে ভালবাসা রডোড্রেনড্রন গুচ্ছ, এখানে কুয়াশা এক ছন্নছাড়া মেঘ, এখানে পাইনের হাতছানি, আর সব  তুচ্ছ - সিয়াটেলের বেশ বদনাম রয়েছে এ জন্য যে সিয়াটেল বৃষ্টির শহর। গ্রীষ্মকাল চলে গেলেই শুরু  হয়ে যায় বৃষ্টির আনাগোনা। চলে পরের গ্রীষ্ম অব্ধি। বৃষ্টি ভালবাসি বলেই বোধহয়, সিয়াটেল আমার এত প্রিয় শহর। আমার কর্মভূমি। আসলে ব্যাপারটা বোধহয় অতটা লঘু করে দেখলে হবে না। আমি উত্তরবঙ্গের ছেলে। বড় হয়েছি পাহাড়ের প্রচ্ছন্ন আদরে, মেঘ আর বৃষ্টির সাথে খুনসুটি করে। কি জানি, মনে মনে আমি বোধহয় ওই ফেলে আসা ছেলেবেলা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করি এখানেই। আর সেজন্যই বোধহয় এই শহর এত প্রিয়। 


আমেরিকার উত্তর পশ্চিম প্রান্তের এই রাজ্যে বিশ্ববিধাতা বোধহয় একটু বেশিই পক্ষপাতিত্ব করে ফেলেছেন। প্রকৃতি যেন দুহাত উজাড় করে সব ঢেলে দিয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরের এই উপকুলে। এখান থেকে আধঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে গেলেই একেবারে সোজা পাহাড়ের কোলে । পথের পাশে নাম না জানা ঝর্না, কুলকুল করে বয়ে যাওয়া চঞ্চল তন্বী পাথুরে নদী। ওপর দিয়ে একটা রেল ব্রিজ। মনে হয় যেন কোথাও আগে দেখেছি এরকম জায়গা। হাসিমারা থেকে সেবক হয়ে এনজেপি যাওয়ার ট্রেন রাস্তাটা ঠিক এরকম না! পাশে পাহাড়ের কোলে মেঘ খেলে বেড়াচ্ছে। প্রকৃতির মন ভার। আমি এখানে উত্তরবঙ্গের ছোঁয়া পাই খুব। বৃষ্টি দেখতে গেলে  ড্রাইভ করে চলে যাই কাছে পিঠে কোথাও। মনখারাপ লাগলে, বাড়ির জন্য মন কেমন করলেও ছুটে যাই ওই পাহাড় থেকে নেমে আসা ছোট্ট পাথুরে নদীর কাছে। দুদণ্ড আলাপ করি নিজের সাথে। বয়ে যাওয়া নদীর জলের সাথে। আমি চলে যাই উত্তরবঙ্গের ছেলেবেলায়। ফি বছর শীতকাল পড়লেই যেমন ছুটে যেতাম ডুয়ারস এ। কালীখোলা, কালিঝোরা, ভুটানঘাট, দলসিংপাড়া জয়ন্তী বা ফুন্টশেলিং । নদীর ধারে রান্না হত, ওখানেই পাত পেড়ে খাওয়া। কেউ বা যেত কাছে পিঠে কোথাও কমলা বাগানে। এখানে কমলালেবু হয় না। কিন্তু ওয়াশিংটনের আপেল জগৎ বিখ্যাত। বাড়িতে একটা গাছ লাগিয়েছি বছর পাঁচেক হল। প্রতিবছর আপেলের ভারে গাছের ডাল মাটিতে নুইয়ে পড়ে। বাড়ি থেকে নিয়ে আসা বিরিয়ানি দিয়ে পিকনিক হয় সপরিবারে। সিয়াটেল তাই আমার কাছে যেন আমার শৈশবে ফিরে যাওয়া। 


আমার বাড়ি কোচবিহারের দিনহাটায়। প্রান্তিক এই শহরে বড় হয়েছি ছোটবেলা থেকে আর পাঁচটা উত্তরবঙ্গীয় ছেলের মতই। পড়াশোনা করার থেকে খেলাধুলোতে মন থাকত বেশি। মাধ্যমিক পরীক্ষার পর বাবার হাত ধরে চলে এসেছিলাম কলকাতায়। রামকৃষ্ণ মিশনে পড়বো বলে। মনে আছে সে বছর উত্তরবঙ্গে বন্যা হয়েছিল ভয়ঙ্কর। তিস্তা, তোরসা, কালজানি, ধরলা, মহানন্দা , জলঢাকা সব নদীর জলই বিপদসীমার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল। টানা দশদিন ধরে অবিরাম বৃষ্টি । ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের দুপাশের ধান খেত, পাট খেত সব জলমগ্ন। মনে হয়েছিল যেন কুলহীন এক নদী পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে বয়ে চলেছে। 

সেই যে বের হয়েছিলাম বাড়ি থেকে, ফেরা আর হল না। কলকাতা থেকে হায়দরাবাদ, সেখান থেকে ব্যাঙ্গালোর, প্যারিস, লন্ডন ঘুরে হাজির হলাম অতলান্তিক পেরিয়ে সুদূর আমেরিকায়। ব্যাঙ্গালোরের বাড়ি ঘর ছেড়ে আক্ষরিক অর্থেই একটা সুটকেস হাতে নিয়ে দু বছরের কন্যা আর সহধর্মিণীকে নিয়ে পৌঁছে গেলাম অ্যারিজোনার ফিনিক্স শহরে। কিন্তু এ কেমন শহর !  শুনেছি আমেরিকা স্বপ্নের দেশ। সম্ভাবনার দেশ। আমাদের মননে আমেরিকার যে ছবিটা আমরা সযত্নে লালন করি এ শহর সেরকম নয় তো। ছোট ছোট বাড়ি, গাছপালা নেই বললেই চলে, মাঝে মাঝে বড় বড় ক্যাকটাস আর গুল্ম জাতীয় কিছু গাছ। রুক্ষ মরুভূমির জায়গা। বড় বড় রাস্তা আর সেখানে হু হু গতিতে চলে যাচ্ছে কত কত গাড়ি। কিন্তু লোকজন দেখি না তেমন কোথাও। ভারতীয় দোকান নেই বললেই চলে। একটা এশিয়ান দোকানের একটা তাকে তেল নুন মশলাপাতি আর চাল পাওয়া যেত। শুরু হল আবার নতুন করে সব কিছু। মেয়ের স্কুল, আমার অফিস এসব নিয়ে মানিয়ে নিচ্ছিলাম আস্তে আস্তে। দু একজন বাঙালির সাথে বন্ধুত্ব হল। দেখা হলেই আমরা দুঃখ করি দেশের শাক সবজি খেতে পাই না, ছোট মাছ খাইনা কত দিন।  বোরোলী, পুঁটি, ট্যাংরা পাবদা  কবে খেয়েছিলাম ভুলে গেছি। সবে গুছিয়ে নিতে শুরু করেছি, ডাক পড়ল পূর্ব উপকুলে। আবার সেই ছিন্নমূল জীবন। এসে পড়লাম কানেটিকটে। সেবারের দুর্গাপুজোয় একসঙ্গে দেখলাম এত বাঙালি। সবাই খুব আন্তরিক। সপ্তাহান্তে দুর্গাপুজো হয় এখানে। 

দিনহাটায় আমাদের বাড়ির সামনেই একটা দুর্গাপুজো হয়। ছোটবেলা থেকে ওই দুর্গাপুজো আমার জীবনের একটা অংশ। তখন এলপি রেকর্ড এ কিশোর কুমার এর কণ্ঠে বাজত, আমার পূজার ফুল, আর লতা মঙ্গেসকরের গলায়, আর নয় গুনগুন গুঞ্জন প্রেমের। নবমীর দিন রাতে বৃষ্টি যেন হবেই। বড়রা বলতেন মা চলে যাচ্ছেন, তাই প্রকৃতি কাঁদছেন। এখানে পুজোর সময়টা হেমন্তকাল । পাতা রঙিন হবার সময়। পাতাঝরার দিনও বটে।  


পরে বুঝেছি  আমেরিকা প্রকৃতিগত ভাবে কতটা বৈচিত্র্যময়। এখানে প্রত্যেকটা মরশুম বোঝা যায় খুব সহজেই। পাতাঝরার মরশুম বা বসন্ত জাগ্রত দ্বারে। কানেটিকট ছেড়ে সিয়াটেলে যখন এলাম সবাই বলছিল, আরে যাস না, ওখানে শুধু বৃষ্টি আর বৃষ্টি। কিন্তু তারা তো জানে না ওই  পাইনের মাথায় লেগে থাকা মেঘ, টুপ টুপ করে ঝরে পরা বৃষ্টির ফোঁটা গাছের পাতা বেয়ে, বা ওই যে পাশ দিয়ে বয়ে চলা চঞ্চল পাথুরে নদী, এগুলোই তো আমার সারা জীবনের পাথেয়। আমার নিজের একটুকরো উত্তরবঙ্গ।

চিরসখা হে


এখানে বৃষ্টি পড়ে বারোমাস, এখানে ভালবাসা রডোড্রেনড্রন গুচ্ছ, এখানে কুয়াশা এক ছন্নছাড়া মেঘ, এখানে পাইনের হাতছানি, আর সব  তুচ্ছ - সিয়াটেল । সবাই বলে বৃষ্টির শহর। বৃষ্টি ভালবাসি বলেই বোধহয়, সিয়াটেল আমার এত প্রিয় শহর। আমার কর্মভূমি। আমি উত্তরবঙ্গের ছেলে। বড় হয়েছি পাহাড়ের প্রচ্ছন্ন আদরে, মেঘ আর বৃষ্টির সাথে খুনসুটি করে। কি জানি, মনে মনে আমি বোধহয় ওই ফেলে আসা ছেলেবেলা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করি এখানেই। আর সেজন্যই বোধহয় এই শহর এত প্রিয়। 
শ্রাবণের ধারার  মত স্মৃতিরা ঝরে পরে আমার সুখ দুঃখের পরে। আর এই স্মৃতির মহীরুহ হয়ে আমাকে আগলে রেখেছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। 

১
রবীন্দ্রনাথের সাথে আমাদের সবার পরিচয় সেই ছোটবেলাতে। যখন প্রথম পড়তে শিখি। ছোট খোকা বলে অ আ দিয়ে শুরু । তখন জানতাম না, ওই সহজ পাঠের দুটো ভাগ তাঁরই লেখা। অনেক পরে বড় হয়ে বুঝেছি ওই দুটো বই আমাদের জীবনে কত বড় প্রভাব ফেলেছিল। আমরা যারা বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনা করেছি, তাদের সবার জীবনের প্রাথমিক ভিত তৈরি হয়েছিল ওই দুটো বইয়ের হাত ধরেই। আজ মঙ্গলবার, পাড়ার জঙ্গল সাফ করার দিন। সরল মনে মেনে নিয়েছিলাম সপ্তাহে শুধু মঙ্গলবার ই বুঝি ধার্য থাকে জঙ্গল পরিষ্কার করার জন্য। আমাদের স্থানীয় ক্লাব, রবীন্দ্র বিকাশ সঙ্ঘ - রবীন্দ্রনাথের নামেই নামাঙ্কিত- থেকে আয়োজন করা হত পাড়ার আবর্জনা সাফ করার পর্ব। মঙ্গলবার করেই। অনেক পরে বড় হয়ে বুঝেছি কী অবলীলায় খেলাচ্ছলে রবীন্দ্রনাথ শিখিয়ে গেছেন যুক্তাক্ষরের সহজ পাঠ। আমরা কোনদিন কোন জিজ্ঞাসা না করেই আনন্দভরে পড়ে গেছি সহজ পাঠ। আর আমাদের বড় হওয়ার প্রতিটি মুহূর্তকে আস্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছে বই দুখানি।
২
রবীন্দ্রনাথের সাথে পরিচয় তারও অনেক আগে। অজান্তেই । মায়ের হাত ধরে।মাকে বহুবার গুনগুন করে গাইতে শুনেছি, আমার সকল দুঃখের প্রদীপ/ জ্বেলে দিবস গেলে করব নিবেদন। আমার ব্যাথার পূজা হয়নি সমাপন। খালি গলায় গাইতেন। এতটা দরদ দিয়ে গাইতে শুনিনি কোনদিন কাউকে। বহুবার দেখেছি মায়ের গাল গড়িয়ে চোখের জল পড়তে, এই গানটি গাইবার সময়। আমার ভীষণ রাগ হত তখন। এরকম গান গাওয়ার দরকারই বা কি? যেটা গাইতে গাইয়ে চোখের জল ফেলতে হয়। মনে মনে রাগ পুষে রাখতাম তাঁর জন্য যে এরকম একটা গান লিখেছেন।
সন্ধ্যেবেলায় বাড়িতে হ্যারিকেনের নিবু নিবু আলোতে মা বই পরতেন বা বুধবারের বাংলা নাটক শুনতেন আকাশবাণীতে। আমি তখন ছোট। বাবা বাজারে থাকতেন। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে ব্যস্ত। বাড়িতে দুটো প্রাণী বলতে আমি আর মা। নাটক শোনার আগে রেডিওতে সাঁওতাল ভাষার একটা অনুষ্ঠান হত। আর তারপর নাটক। ওই অনুষ্ঠান শুরু হলেই অপেক্ষায় থাকতাম কখন নাটক শুরু হবে। ওই সময়কার ভীরু ভীরু সন্ধ্যেগুলোতে বাড়িতে যখন আমি আর মা ছাড়া কেউ নেই, ওই সময়টা ছিল আমাদের একান্ত ব্যক্তিগত অনুভব বিনিময়ের সময়। তুচ্ছ কিছু আনন্দ, দুঃখ , সুখ। আমার সকল দুঃখের প্রদীপ এর আমি একমাত্র শ্রোতা। কোনদিন ভাগ করে নিতে হয়নি অন্য কারো সাথে।
অনেক পরে বড় হয়ে বুঝেছি, আমাদের সবার, প্রত্যেকের জীবনে এমন কোন অনুভব নেই যা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ গান লেখেননি। আমাদের সবার একত্রিত অনুভব কীভাবে একটা লোক জেনে গেল এবং আজও তার কোন ব্যাতয় হয় না, এইটা ভেবেই খুব অবাক লাগে। আমার সকল দুঃখের প্রদীপের আমার কাছে একটা স্বপ্নের মত। এটা সবার থেকে আলাদা, কারও সাথে ভাগ করে নেবার নয়।
৩
আরও ছোটবেলায় একবার মার হাত ধরে মামার বাড়ি গিয়েছিলাম। প্রত্যন্ত গ্রামে। মামার বাড়ির চারপাশে আরও কয়েকটা বাড়ি আর তার পাশেই চাষের জমি। এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত সবুজ মাঠ। শীতকালে জমির আল ধরে হেঁটে গেছি, পায়ে লেগে আছে সারারাতের পড়ে থাকা হিম। মামার বাড়ির পাশেই ইরিগেশন বিভাগের একটা চৌবাচ্চা ছিল। সেখানে খুব জোরে জল আসত মেশিনকল থেকে। সেখান থেকে জল বণ্টন করা হত আশে পাশের ক্ষেতগুলোতে। সর্ষে ফুলে ভরে থাকত ক্ষেতগুলো। কোনটাতে ফুলকপি, কোথাও বা বেগুন, কোথাও বা পালং শাক। মামার বাড়ির কাছাকাছি ছিল আমাদের একটা পাড়াতুতো মাসির বাড়ি। মায়ের বান্ধবী। মা, মামার বাড়ি গেলেই দেখা করতে যেত বান্ধবীর সাথে। কাঠের বাড়ি। কাঠের উঁচু মেঝে, কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হত। নিকনো উঠোনের এক কোনায় তুলসী পাট। শীতের এক সকালে মায়ের হাত ধরে গেছি ওই মাসির বাড়িতে। দূর থেকে শুনতে পেলাম বাড়ি থেকে হারমোনিয়ামে গান ভেসে আসছে, খোল খোল দ্বার, রাখিয়োনা আর বাহিরে আমায় দাঁড়ায়ে। আরে এত আমারই কথা। যদিও তখনও আমরা বাড়িতে ঢুকিনি। প্রত্যন্ত গ্রামে যেখানে বাস থেকে নেমে কখনও কখনও হেঁটে বা কখনও গোরুরগাড়িতে চেপে যেতে হয়, যেখানে দু বেলা যারা নিজেদের চাষের ফসলে দুমুঠো খেয়ে দিন পার করে দেয়, সারা বিশ্বে কি হল বা না হল তাতে কিছু যায় আসে না, সন্ধ্যের পর বট পাকুড় এর তলা দিয়ে হাটে যাওয়া বারণ রবীন্দ্রনাথ তাঁদেরও হেঁশেলে, শয়নে স্বপনে জাগরণে। আজও যখন আমি খোল খোল দ্বার শুনি,আমি ফিরে যাই আমার শৈশবে। ওই আলপথ। ফুলকপির ক্ষেত। ঘাসের ওপর পড়ে থেকে সারারাতের হিম। আচ্ছন্ন করে দেয় মন।
৪
আমাদের গ্রামের বাড়ির পাশে একটা বেসিক ট্রেনিং কলেজ আছে। ওই কলেজর যে বুনিয়াদি প্রাইমারি স্কুল আছে সেখানেই আমরা পড়াশোনা করেছি। আমাদের সময় ওই কলেজ ছিল খ্যাতির শীর্ষে। প্রতি বছর একশোর বেশি হবু শিক্ষক ও শিক্ষিকারা আসতেন আবাসিক এই কলেজ এ শিক্ষা নিতে। সবথেকে সংস্কৃতিমনস্ক অধ্যাপক যিনি ছিলেন তাঁর নাম সুনীতি বিশ্বাস। আবাসিকদের সকলের বড়দি। আমাদের ছোটদের কাছে বড়পিসি। বিয়ে করেননি কোনদিন। পুরো জীবন দিয়ে গেছেন শিক্ষায় আর সংস্কৃতিতে। মূলত তাঁরই উদ্যোগে হত বছর জুড়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কবিতা আবৃত্তি, গান,নাটক, নাচ, গীতিনাট্য, রবীন্দ্রজয়ন্তী সব হত তাঁর নিজের হাতে সযত্নে সাজিয়ে। আমরা খুদেরা আগ্রহ ভরে অংশ নিতাম সেসব অনুষ্ঠানে। স্টেজে দাঁড়িয়ে একবার দুবার তো ভুলেও গেছি দু একটা কবিতার লাইন। বসন্ত উৎসবে যখন দোল খেলা হত বড়পিসি আবিরের সাথে মিশিয়ে দিতেন গাঁদাফুলের পাপড়ি। এখনও মনে পড়ে । বসন্ত উৎসবেই দেখি দুই খুদেকে, ওরে গৃহবাসী, খোল দ্বার খোল গানে রবীন্দ্রনৃত্য করতে। লাল পেড়ে শাড়ি, হাতে গলায় শাদা কাগজের ফুল, একেবারে ঠিক পরীর মত লাগছিল ওদের। সেই প্রথম ভাললাগা। ইচ্ছে হচ্ছিল সামনে গিয়ে কথা বলি। সাহস হয়নি কখনও। দুজনেই গান হয়ে রয়ে গেছে স্মৃতিতে।
৫
আর একদিন, ইংরিজি টিউশন থেকে ফিরছি। একটু দেরিই হয়ে গেছে সেদিন। পাশাপাশি হাঁটছি আমরা দুজনে। হঠাৎ কে জানে কোথা থেকে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমে এলো। সন্ধ্যে হয়ে আসছে। আলো ম্লান হয়ে এসেছে একটু বেশিই। আমরা দুজনেই ছুটে  একটা বন্ধ দোকানের সামনে এসে দাঁড়ালাম। দুজনেই বৃষ্টিতে ভিজে একশা। একটা মৃদু আলো জ্বলছে টিমটিম করে দোকানের সামনে। বৃষ্টিতে চারিদিকে ঝাপসা হয়ে এসেছে। মনে হল সমাজ সংসারে আর কেউ নেই আমরা দুজন ছাড়া। বিদ্যুতের হঠাৎ আলোর ঝলকানির সাথে ওর মুখটা দেখতে পেলাম। উজ্জ্বল এক আভায় ভরে গেছে। ভ্রুপল্লব থেকে টুপ করে একফোঁটা বৃষ্টির জল বুঝি গড়িয়ে নামল মুক্তোর মত। হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছি দুজন দুজনের দিকে। আঁধারে মিশে গেছে আর সব। শুনলাম দুর থেকে ভেসে আসছে হাল্কা এক গানের আভাস। তুমি কোন ভাঙনের পথে এলে, সুপ্ত রাতে। বৃষ্টির সাথে তাই আমার এত সখ্য। 
৫
দীপঙ্কর মহারাজের গলায় প্রথম শুনি দাঁড়িয়ে আছো তুমি আমার গানের ওপারে। মহারাজের দরাজ উদাত্ত গলায় প্রথমবার শুনেই মোহিত হয়ে গিয়েছিলাম। পরবর্তীকালে রেকর্ডিংও করেছিলাম গানটা। আমি তখন ইলেভেনে পড়ি। রবীন্দ্রনাথ অনেকটাই গ্রাস করে নিয়েছেন আমায় ততদিনে। জীবন সম্পর্কে অনেক কৌতূহল, অনেক প্রশ্ন। নিষিদ্ধের হাতছানি। বখে যেতে পারিনি। দাঁড়িয়ে আছেন তিনি আজও আমার গানের ওপারে।
------------------------------------------------------ 0 -----------------------------------------------------