২০১৯ এর বর্ষণমুখর একটা দিন। ২৬ বছর পরে স্কুলে এসেছি। দুপুরবেলা। টিফিন পিরিয়ড হবে বোধ হয়। অনেক ছাত্রছাত্রীদের মাঠে দেখা যাচ্ছে। লালপেড়ে সাদা শাড়িপড়া একদল কিশোরীরা সাইকেল নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। কিছু ছেলেরা মাঠে খেলছে আবার একদঙ্গল কিশোর একজায়গায় দাঁড়িয়ে গল্প করছে। স্কুলের মেন বিল্ডিংয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। ঠিক তখনই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমে এলো। ক্ষণিকের মধ্যেই সারা মাঠ ভিজে একাকার। সামনের বড় রেইন ট্রি গাছটা ঠায় দাঁড়িয়ে ভিজছে। বাচ্চারা এদিক ওদিক দৌড়ে ক্লাসরুমের দিকে যাচ্ছে। পকেট থেকে ফোনটা বের করে টুক করে কয়েকটা ছবি তুললাম। কাকু কেন ছবি তুলছেন? আপনি কি সাংবাদিক? কোনও পেপারে কি দেবেন ছবিটা ? ঘুরে তাকিয়ে দেখি এক ছাত্র কৌতূহলী হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করছে। আমার হঠাৎ মনে হল একটা সময় তো সত্যি সাংবাদিক হতে ছেয়েছিলাম ! War Correspondent ! হয়ে উঠলো না কোন দিন। আমি উত্তর দিলাম, না এমনি ছবি তুলছি, নিজের কাছে রেখে দেব বলে। আমি তো এই স্কুলে পড়তাম , তাই ভাবলাম একটা ছবি তুলি। আমাকে ছেলেটি জিজ্ঞেস করল, ও আপনি কোন সময় পড়তেন ? ভাবলাম একটু হেঁয়ালি করি। আমি উলটে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কোন ক্লাসএ পড় ? ছেলেটি বলল এবার উচ্চমাধ্যমিক দেব। আমি আরও হেঁয়ালি করে বললাম, আমি যখন পড়তাম, তখন তোমার জন্ম হয়নি । বলেই ভাবলাম, সত্যি তো, এতদিন হয়ে গেল? শেষ পা রেখেছিলাম ২৬ বছর আগে। অথচ মুষলধারে বৃষ্টি পরার এই দৃশ্যটি তো কোন সময় এর গণ্ডিতে বেঁধে রাখা যায় না। ছেলেগুলোকে বৃষ্টিতে ভিজতে দেখে আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল বৃষ্টিতে ভিজি নিজেও । যদি আমাদের সময়ের স্বাদ পাওয়া যায় একটু। সাহস হল না। ওই যে বললাম এদের কাছে আমি তো এখন প্রায় বুড়োই । চিরন্তন এই ছবিটি কতকিছু মনে করিয়ে দিল। ওই বয়সে কত ভিজেছি বৃষ্টিতে। বাড়িতে বকা খেয়েছি কত। এখন কেউ বকা দেয় না, কিন্তু সাহস হল না। দর্শক হয়ে রয়ে গেলাম আর সযত্নে মনের মণিকোঠায় রেখে দেওয়া কিছু স্মৃতি নেড়েচেড়ে দেখে আবার রেখে দিলাম। এইভাবেই স্কুলে ভিজতাম আমরা সবাই।স্কুলের টিফিনের ঘণ্টা পড়লে যত বৃষ্টিই হোক, কেউ আটকাতে পারত না আমাদের। যত ছবি তুলেছি এতদিন, এই ছবিটি খুব আলাদা ভাবে আমার পছন্দের ছোট্ট তালিকায় স্থান করে নিল। আমি দেখলাম, আমার শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পা দেওয়ার সন্ধিক্ষণের আমিকে যেন আবার।
২
সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। শীতকালে ঝুপ করে কখন যে সন্ধ্যে নামে বোঝাই যায় না। স্কুলের মাঠে ছেলেদের কোলাহল শোনা যাচ্ছে। ক্রিকেট খেলা হচ্ছে। এই বুঝি একটা চার হল। বাউন্ডারির বাইরে বল চলে গেছে। কিছুক্ষণ পরে আর বল বোধহয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। স্কুল ছুটি হয়ে গেছে অনেক আগেই। আজকে ছিল শেষ দিন। মাধ্যমিকের টেস্ট পরীক্ষার পর আর স্কুলে আসতে হবে না। তিন মাস বাড়িতেই পড়াশোনা, তারপর জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা। শেষ পিরিয়ডে এসে সবার মন খারাপ। দেখা হবে না বন্ধুদের সাথে কতদিন। আমরা যারা স্কুলের কাছাকাছি থাকি তাদের অবশ্য কথা আলাদা। যাইহোক এই মুহূর্তে স্কুল শুনশান। শুধু ক্লাস টেন এর এ সেকশনের ঘরটায় একজন মাস্টারমশাই একমনে অঙ্ক কষে চলেছেন। একজন মাস্টারমশাই আর একজন ছাত্র। শুরুর দিকে আর একজন ছাত্রী ছিল বটে কিন্তু সে প্রথম দু তিন দিন ক্লাস করার পর আর এ মুখো হয় নি। কেন কে জানে। এই ক্লাসটি আর বাকি ক্লাস গুলোর মতন নয়। এখানে মাস্টারমশাই নিজেই অঙ্ক কষেন, জটিল সব অঙ্ক সমাধান করেন নিজেই আর তারপর ছাত্রকে ডেকে বুঝিয়ে দেন। এই মুহূর্তে মাস্টারমশাই মাথা গুঁজে খাতায় পাতার পর পাতা বীজগণিতের জটিল তত্ত্ব সমাধান করছেন। কিশোর ছাত্রটি জানালার গরাদ ধরে দাঁড়িয়ে বাইরের মাঠের দিকে দেখছে এক দৃষ্টিতে। মাঠে বাকি কিশোররা ক্রিকেট খেলায় মত্ত। বয়স্করা সান্ধ্য ভ্রমণে বের হয়েছেন। চারিদিকে একটা ধোঁয়াশা ভাব। অনেক দুরে বাড়ি থেকে সন্ধ্যার শাঁখ শোনা যাচ্ছে। এবারে বোধহয় ছুটি হবে।
সেদিন যখন বাড়ি ফিরছি, মনটা খুব ভারাক্রান্ত ছিল। পিছনে ফিরে স্কুলের দিকে তাকালাম একবার। মনে হচ্ছিল স্কুল থেকে যত দুরে যাচ্ছি স্কুল বাড়িটা আস্তে আস্তে যেন বড় হয়ে আকাশ ছুঁয়ে যাচ্ছে। চারিদিকে কেউ কোথাও নেই। আমি একা একা ফিরছি। অন্ধকার হয়ে এসেছে। সেদিন মনে আছে আমি সবার শেষে স্কুল থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম। সেদিন জানতাম না আর কোনদিন স্কুলের ক্লাসঘরে ঢোকা হবে না। গুরুগম্ভীর স্বরে কৃষ্ণানন্দবাবুর ইংরিজি পড়া শোনা হবে না। বা রঞ্জিতবাবুর কাছ থেকে অন্নপূর্ণা আর ঈশ্বর পাটনির গল্প শুনতে পাবনা। অলোকবাবু ডেকে বলবেন না, কিভাবে ত্রিকোণমিত্রির সাইন, কস বা ট্যান এর মান মুখস্ত না করেও মনে রাখা যায়। ক্লাস ফাইভ থেকে ওই যে পদার্থবিজ্ঞান আর রসায়নের ল্যাবরেটরি দেখেছি স্কুল বাড়িতে ওগুলোতে কোনদিন ঢোকা হবে না। ছবিটা ঝাপসা হতে শুরু করেছে। কিছুই ভাল করে দেখতে পাচ্ছিনা। চোখের কোণটা ভিজে উঠেছে। এতদিন বুঝিনি । স্কুলের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়েছিলাম। প্রত্যেকটা অনুষ্ঠানে, খেলাধুলায় বা এন সি সিতে, আমরা বন্ধুরা সবসময় এগিয়ে থাকতাম। এই প্রথম হারিয়ে যাওয়ার একটা ভয় হঠাৎ মনে এলো। আমাদের সবাইকে একদিন এই স্কুল ছেড়ে জীবনের যুদ্ধে পাড়ি দিতে হবে। কতজনের সাথে আর বুঝি কখনো দেখাই হবে না। ভবেশ মৈত্র বলে একটি ছেলে আমাদের সাথে পড়ত ক্লাস ফাইভে। তার সাথে কোনোদিন দেখা হবে কি না জানি না। গুরুজনেরা সব সময় বলতেন, সবচেয়ে সুখের জীবন হল ছাত্র জীবন। এর থেকে ডাহা মিথ্যে কিছু হয় নাকি। বলি এত এত পড়াশোনা করতে কার বা ভাল লাগে ? পাতার পর পাতা ইতিহাস পড়ার দিব্যি যে কে দেয় কে জানে। আর ওই শক্ত শক্ত অঙ্ক করতে কে দিয়েছিল কে জানে। ত্রিকোণমিতি জেনে কি হবে ? কঠিন কঠিন অঙ্ক বা কেমিস্ট্রির সূত্র । এসব মুখস্ত করতে কোনও দিন ভাল লাগে নি। কিন্তু ভাল লাগত স্কুল। তার কারণ অবশ্যই সব বন্ধুরা। প্রতিদিন যাদের সাথে খেলতে না পারলে ভাল লাগত না। হঠাৎ মনে হল, স্কুল না থাকলে বন্ধুদের সাথে দেখা হবে কি করে? সবাই বড় হয়ে যখন নিজের নিজের রাস্তায় এগিয়ে যাবে তখন আদৌ কি বন্ধুদের সাথে নিয়মিত দেখা হবে? হবে না বোধহয়। ভাবতেই শিরদাঁড়া দিয়ে বোধহয় একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল। আমি থমকে দাঁড়ালাম। আমার পা সড়ছিল না। হাপুস নয়নে অঝোরধারা বইছে।
৩
সাত সকালে ঘুম ভাঙল সন্তোষের ডাকে। চোখ কচলাতে কচলাতে বাইরে বেরিয়ে এলাম। সর্বনাশ হয়ে গেছে বুঝলি, কাল রাতে স্কুলে বড় একটা চুরি হয়ে গেছে। ঠাকুরদার ঘরের তালা ভেঙ্গে আমাদের সরস্বতী পূজার জন্য কেনা সব জিনিষ চুরি হয়ে গেছে। স্টাফ রুমের পাশে ছিল হেড স্যারের রুম আর তার পাশে এন সি সি র রুম। ওই ঘরেই এক কোনে ছিল ঠাকুরদার বিছানা। রাতে থাকতেন ওখানেই। ঠাকুরদা ছিলেন স্কুলের কেয়ারটেকার। প্রতিদিন স্কুল ছুটি হলে প্রত্যেকটা ক্লাস রুমে তালা বন্ধ করা ছিল ওঁর দায়িত্ব।আমার মনে অদম্য কৌতূহল ছিল ঠাকুরদাকে নিয়ে। যদিও তিনি প্রায় ঠাকুরদারই বয়সী তবুও দেখতাম বড়রাও ডাকতেন ঠাকুরদা বলে। আমার বাবা যখন স্কুলে পড়তেন তখনও বোধ হয় উনি ছিলেন এখানেই। আমাদের সবাইকে উনি চিনতেন অমুকের ছেলে বা তমুকের ভাই বলে। আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছি এই একজন লোককে যাকে ছাড়া স্কুলকে ভাবাই যায় না। ছোটরা ঠাকুরদা বললে তবুও মানায়, কিন্তু বড়রাও যখন ঠাকুরদা বলে ডাকতেন তখন অবাক হয়ে যেতাম। অনেক পরে অবশ্য জেনেছিলাম উনি আসলে ছিলেন আশ্রমের রাঁধুনি। সেজন্য তাকে বলা হত ঠাকুর মশাই। সেখান থেকেই ঠাকুরদা। ভাল নাম রমাকান্ত ঝা। আমি নিশ্চিত অনেকেই এ নামটি জানতেন না।
আমাদের সবার মন খারাপ, একে একে সব বন্ধুরা জানতে পারলাম স্কুলের সরস্বতী পূজার সব আয়োজন আবার প্রথম থেকে শুরু করতে হবে। থমথম একটা পরিবেশ স্কুলে। মাস্টারমশাইরা সিদ্ধান্ত নিলেন এবারে পূজা বাইরে আর প্যান্ড্যাল করে করা যাবে না। বাজেট নেই। তাই পূর্বদিকের একটা ক্লাস রুমের মধ্যেই করতে হবে পূজা। সেবার আমাদের ক্লাসের ওপরে ছিল স্কুলের পূজার দায়িত্বে। আমরা কোমর বেঁধে নেমে পড়লাম । আমি, সন্তোষ, রিটন, নারায়ণ, অমল, শিবশঙ্কর, সাধন আরও অনেকেই। সারারাত জেগে ক্লাস রুমের মধ্যেই মণ্ডপ তৈরির কাজ শুরু হল। স্টেন্সিল কেটে আলপনা দেওয়া হল মেঝেতে। সাদা থারমোকল কেটে বানানো হল মণ্ডপসজ্জা। জয়ন্ত এসেছিল ঘাটপাড় থেকে। সারা রাত আমাদের সাথে হাতে হাত লাগিয়েছিল সেদিন। জয়ন্তর খুব একটা সুনাম ছিল না ছাত্র হিসেবে। ওই বয়সেই ও অনেক বড়দের ব্যাপার স্যাপারে পটু ছিল। আমাদের কাছে তখন সিগারেট অচ্ছুত একটা বিষয়। জয়ন্ত অবলীলায় সেসব হাতে নিয়ে কেরামতি দেখাল। জয়ন্ত যে পড়াশোনাকে খুব একটা গুরুত্ব দিত তা বোধহয় ও নিজেও বলবে না। আমাদের বন্ধুর দলেও ছিল না কোনও দিন। কিন্তু সেই সরস্বতী পূজার আগের রাতে আমি সম্পূর্ণ আর এক অন্য জয়ন্তকে চিনেছিলাম। এই জয়ন্ত যে বন্ধুদের জন্য জান লড়িয়ে দিতে পারে। এ জয়ন্ত একা নিজে হাতে সরস্বতী মণ্ডপ বানানোর দায়িত্ব নিতে পিছপা হয় নি। অবাধ্য ছেলেটার ভিতরে যে আর একটা দায়িত্বশীল, শ্রদ্ধাশীল, বিনীত একটা কিশোর লুকিয়ে আছে সেটা ওই রাতে ওর সাথে না মিশলে বুঝতে পারতাম না।
সকাল হতেই আস্তে আস্তে ছাত্রদের আনাগোনা শুরু হল স্কুলে। ইতোমধ্যেই আমরা যারা কাছাকাছি থাকি, বাড়িতে এসে স্নান করে আবার স্কুলে পৌঁছে গেছি। মনে মনে ভীষণ উত্তেজিত । সবাই আমাদের ডেকোরেশন দেখে কি বলে সেটা জানার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছি। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার খুব স্পেশাল কাউকে ইমপ্রেস করার জন্য তৈরি। সারা বছর যে কিনা সাহস জোগাড় করে কথা বলতে পারেনি, সরস্বতী পূজার দিনে সেও ভেবেছে মনের কথাটা মনের মানুষকে বলেই ফেলবে চুপিচুপি। বাকিরা পাহাড়ায় থাকব যদি পাছে কেউ দেখে ফেলে । মায়ের পাট ভাঙ্গা শাড়ি, লম্বা করে টানা কাজল কালো চোখে চোখ রাখার সাহস সঞ্চয় হচ্ছে। কথা না হলে নিদেনপক্ষে একটা চিরকুট। বাঙালির ভ্যালেন্টাইনডে বলে কথা।
আমি তখন দু একটা চিরকুট পাচ্ছি নিয়মিত। কিছু লিখতে গেলেই কবিতা বেরিয়ে যাচ্ছে। নোট খাতায়, বইয়ের পাতার খাঁজে দুএকটা শুকনো গোলাপও যে থাকছে না সেটা হলপ করে বলা যায় না। একেবারে পাগল পাগল আলুথালু অবস্থা। তখন মোবাইল ফোন ছিল না, হোয়াটসআপ বা মেসেঞ্জার ছিল না। দুর থেকে একটু দেখা পাওয়া যাবে, চোখে চোখ পড়বে ব্যাস এটুকুই। কথা বলাটা তখন বিলাসিতা। অনেকের আবার এক সাথে টিউশন থাকলে বাকিরা হিংসে করত। অভাগীরা স্কুলে পিরিয়ড শেষ হলে ছুটে যাচ্ছে জল খেতে । স্টাফ রুম, হেড স্যার এর রুম পাস কাটিয়ে তবেই টিউবওয়েলের জল খাওয়া যেত। আসলে জল খাওয়াটা একটা ছুতো, জল কলের সামনেই ছিল নাইন আর টেন এর মেয়েদের ক্লাস রুম। যাদের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়েছে, তাদের জল খাওয়ার তাড়া নেই। মাঝে মাঝে ধরা পড়ে একেবারে মাস্টারমশাইয়ের সামনে। দুটো তিনটে প্রশ্ন সবসময় রেডি রাখতাম। মাস্টারমশাই সামনে পড়লেই জিজ্ঞেস করব প্রশ্ন গুলো। একবার এরকমই এক অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন শুনে মাস্টারমশাই বিরক্ত হয়ে গেলেন, ডিম কেন গোল, এটা একটা প্রশ্ন হল ?
৪
শ্রীষবাবুকে সবাই খুব সম্ভ্রম করেন। ছাত্রদের মধ্যে প্রচলিত ছিল যে ওঁর মত অঙ্কের স্যার স্কুলে আর দ্বিতীয় কেউ নেই। শুধু ছাত্ররাই নয়, মাস্টারমশাইদেরও শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন তিনি। হস্টেল এর কোয়ার্টারে থাকতেন তিনি। জলপাই সবুজ রঙের প্যান্ট আর ক্রিম সাদা জামা ছাড়া অন্য কোনও পোশাকে কোনও দেখিনি স্কুলে। শুনেছি ওঁর নাকি এই প্যান্ট আর শার্ট অনেকগুলো আছে। কেন অন্য কোনও রঙের জামাকাপড় পড়তেন না কোনোদিন জানা যায় নি। জিজ্ঞেস করে উঠতে পারিনি কোনোদিন। তিনি ছিলেন প্রকৃত বিদ্বান। ভুলোভালা মানুষ। আসলে আমাদের মত মাঝারি মানের মেধা দিয়ে ওঁকে কখনো চেনা যায় না। আমাদের বিষয়ী চিন্তা ভাবনার থেকে অনেক ঊর্ধ্বে ছিলেন তিনি। বরাবর অকৃতদার, স্ত্রী-জাতি থেকে একটু দুরেই থাকতে ভালবাসতেন। হস্টেলের কোয়ার্টার থেকে স্কুল আসবার সময় ভুলে যেতেন ঘরে তালা লাগিয়েছিলেন কি না। বার বার গিয়ে দেখে আসতেন দরজা বন্ধ আছে কিনা। তালা সত্যি লাগিয়েছেন কি না। কিছু ছাত্রদের নজর এড়াতো না এই সব। পেছনে উস্কে দিত ওঁকে। খুব রেগে যেতেন তখন। পরবর্তী জীবনে কিছু অসামান্য মানুষের সংস্পর্শে এসে বুঝেছি, এ সব তুচ্ছ ব্যাপার এঁদের মাথায় ঢুকত না। ভুলে যেতেন আপাত সহজ ব্যাপার গুলো।
এখন যেখানে আশ্রমে ঢোকার গেট, আগে ওখানে ছিল একটা বড় বট গাছ আর একটা পাকুড় গাছ। পাশাপাশি। সবাই বলে বট আর পাকুড়ের নাকি বিয়ে দেওয়া হয়েছে। ছোটবেলায় আমরা শুনেছি ওই পাকুড় গাছে নাকি ভুত থাকে। সন্ধ্যের পর ওদিক দিয়ে একা একা যাওয়ার কোনও প্রশ্নই নেই। কখনও স্কুলের মাঠে খেলা দেখে দেরি হয়ে গেলে বাড়ি ফেরার পথে বট গাছের কাছে এলে প্রাণ হাতে করে একছুট দিয়ে আশ্রমের মাঠ পেরিয়ে একেবারে সোজা বাড়িতে চলে আসতাম। শুনতাম, বাজার থেকে আসার সময় অনেকেই নাকি ওখানে প্রদীপ দেখতে পেয়েছে। হাওয়াতে ভাসছে। বট গাছ থেকে ঝুরি নামত। স্কুল থেকে ফেরার পথে ঝুরি ধরে দোল খাওয়া হত। কিন্তু সন্ধ্যে নামলেই নো এন্ট্রি।
পাকুড় গাছটা ছিল শ্রীষবাবুর কোয়ার্টারের একেবারে পেছনেই। এরকম একটা গা ছমছম জায়গায় উনি থাকতেন কিভাবে সেটা ছিল আমাদের কাছে বিস্ময়। দু একবার শুনেছি, পাকুড় গাছের ওদিকে থেকে নাকি ওঁর কোয়ার্টারের উঠোনে ভুত ঢিল ছুঁড়ত । এসব যখন শুনতাম গা ছমছম করে উঠত। অনেক পরে অবশ্য এই ঢিল ছোঁড়া ব্যাপারটার সমাধান করা গেছে। পাড়ার দু একজন বিচ্ছু ছোঁড়ার দল এই কাজটা করত। ওদের কি একদম ভয় ডর কিচ্ছু নেই ?
আমি নিজে খুব ভাগ্যবান যে শ্রীষবাবুর সান্নিধ্য পেয়েছি, খুব কাছে থেকে দেখেছি ওঁকে। । আমি যখন টেন এ পড়ি তখন আমার সুযোগ হয়েছিল ওঁর কাছে টিউশন পড়ার। খুব যত্ন করে পড়াতেন আমায়। সেবার ওঁর খুব অসুখ হল। কলকাতা নিয়ে যাওয়া হল চিকিৎসার জন্য। আমি তখন কলকাতায় পড়াশোনা করি। অসুখের ঘোরে খুব ভুলভাল বকছেন। কি করবে কেউ বুঝতে পারছে না। উনি বললেন, আমাকে দেখতে চান । নাহলে উনি কোনও ওষুধ খাবেন না। অতএব আমার ডাক পড়ল। সেন্ট্রাল এভিনিউ এর কাছাকাছি কোথাও একটা জায়গায় বোধ হয় উনি ছিলেন, এখন ঠিক মনে পড়ছে না, গেলাম ওখানে। আমাকে দেখেই চোখটা ওঁর জ্বলজ্বল করে উঠলো । আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম নিষ্পাপ অসহায় এক শিশু, এক প্রবল আকুতি নিয়ে আমার দিয়ে তাকিয়ে আছে।
৫
স্কুলের রীতি ছিল ১১টায় অ্যাসেম্বলির বেল পড়লেই সবাইকে হাজির হতে হবে মাঠে। ক্লাস আর সেকশন অনুযায়ী এক একটা লাইন দিতে হত। ঝড় জল শীত গ্রীষ্ম কোনোদিন বাদ যেত না। এখনও নিশ্চয় হয়। জনগনমন দিয়ে শুরু হত প্রার্থনা। তারপর কোনও একটা বানী । স্কুলের কোনও নির্দেশিকা থাকলে হেড স্যার বলতেন প্রার্থনার সময়। মাঝে মাঝে অনেকে স্কুলে আসতে দেরি করত। হয়ত বা তখনও কেউ মাঠের এক প্রান্তে কিন্তু প্রার্থনার বেল পরে গেছে, যে যেখানে আছে, সেখানেই দাঁড়িয়ে যেত জনগনমন গাওয়ার সময়। অনেকেই আবার প্রার্থনার সময় ফাঁকি দিয়ে ক্লাসরুমেই থেকে যেত। হেড স্যারের বুঝতে খুব একটা সময় লাগল না। জানতে পারলাম এদিকে এসেম্বলি হচ্ছে, আর ওদিকে হেড স্যার বেত হাতে ক্লাস রুমের পর ক্লাস রুম খুঁজে খুঁজে দেখছেন কারা ফাঁকি দিচ্ছে। একবার ঠিক হল যে আমরা যারা এন সি সি করি তাদের দায়িত্ব থাকবে এসেম্বলি লাইনে কুচকাওয়াজ করে যেতে যেতে দেখবে কে স্কুল ড্রেস পরে আসেনি, বা কার স্কুল ড্রেস ঠিক নেই ইত্যাদি। তাদেরকে আলাদা করে জিজ্ঞেস করা হবে। আমরা লেফট রাইট করে যেতে যেতে একেবারে লাইনের শেষে গিয়ে যখন দাঁড়াতাম, দেখতাম লাইনের শেষে কেউ কিছু কেয়ার করে না। লাইনের শেষে কেউ কিছু শুনতেও পায় না।
হেড স্যার গোপাল বাবু ছিলেন প্রচণ্ড শৃঙ্খলা পরায়ণ মানুষ। উনি যতদিন ছিলেন স্কুলের সব থেকে বিচ্ছু ছাত্রও থাকত চুপটি করে। আমরা ভয়ে সব সময় জড়সড় হয়ে থাকতাম। একা নিজের হাতে স্কুলকে গড়ে দিয়েছেন। শীত কালে একটা করে পিরিয়ড শেষ হলেই সবাই বেরিয়ে যেতাম ক্লাস থেকে, মাঠে রোদ পোহাব বলে। হেড স্যার শুধু একবার নিজের ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে দেখতেন আমাদের। ব্যাস, তাতেই কাজ হয়ে যেত। সবাই যে যার মত পড়িমরি করে একেবারে ক্লাসের ভেতরে। স্কুলের গণ্ডির মধ্যে যেরকম কঠিন, তেমনি স্কুলের বাইরে বা বাড়িতে একেবারে অন্যরকম একজন মানুষ। একেবারে পিতৃপ্রতিম একজন মানুষ। স্কুলে আমরাও পরেছি ওঁর শাসনের মধ্যে দু একবার। স্কুল শুরু হওয়ার অনেক আগেই আমরা পৌঁছে যেতাম স্কুলে। ক্লাসরুম এর দরজা বন্ধ করে টেবিল আর বেঞ্চ বাজিয়ে হত হিন্দি গানের মজলিশ। আমি গাইছি আর গৌতম টেবিল বাজাচ্ছে। অনেকেই সুরে সুর মেলাচ্ছে। আমরা স্যার এর পড়ানোর টেবিল এর কাছে আর বাকিরা নিজের নিজের ডেস্ক এ বসে । কেউ গলা মেলাচ্ছে কেউ বা বেঞ্চে তাল দিচ্ছে। কিছুক্ষণ পড়ে খেয়াল হল, সবাই চুপ করে গেছে, কেউ আর বেঞ্চ বাজাচ্ছে না, শুধু আমি গাইছি আর গৌতম টেবিল বাজাচ্ছে। আমরা বুঝতে পারিনি, ইতোমধ্যেই ক্লাস রুমের দুই দরজায় আলো করে দুজন বিশিষ্ট শ্রোতা অনেকক্ষণ ধরে আমাদের শুনছেন। সামনের দরজায় হেড স্যার গোপাল বাবু আর পেছনের দরজায়, অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড স্যার দেবদাসবাবু।
যেন কিছুই হয় এমন একটা ভাব করে আমি আস্তে আস্তে জানালার দিকে এগিয়ে গেলাম, আর তারপর জানলার দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকলাম অনেকক্ষণ। ওঁরা দুজনেই কিছু না বলে চলে গেলেন। কিছু না বলেই এমন একটা শিক্ষা দিয়ে গেলেন যেটা আমরা কোনোদিন আর ভুলিনি।
৬
৩২ তলার ডেস্কের জানলা দিয়ে বাইরে দেখলে বরফে ঢাকা পর্বতশৃঙ্গ দেখা যায়। আর অন্যদিকে কিছুটা দুরে দিগন্ত পেরিয়ে প্রশান্ত মহাসাগর। জল আর আকাশ একাকার হয়ে গেছে ওখানে। বাইরে বেশ ঠাণ্ডা। এক কাপ কফি হাতে নিয়ে জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছি আর তুষারপাত দেখছি। পেঁজা তুলোর মত বরফ পড়ছে । আশেপাশের বাড়ির ছাদ, রাস্তাঘাট সাদা হয়ে যাচ্ছে। অফিসের ঘরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা। ভিতর থেকে বোঝার উপায় নেই যে বাইরেটা এতটা ঠাণ্ডা। এখানে এখন অবশ্য উৎসবের মরশুম। ক্রিসমাস। চারিদিকে সাজো সাজো ব্যাপার। সাত সমুদ্র পার করে এসেছি এই দেশে। এখানে ব্যস্ত জীবন। সব কেমন যেন নিয়মে বাঁধা। এখানে সময়কে মুদ্রায় মাপা হয়। সময় নষ্ট করবার সময় নেই।
কফির কাপে চুমুক দিয়ে তাকিয়ে থাকি প্রশান্ত মহাসাগরের ওপারে। যেখানে দিগন্ত মিলে মিশে একাকার। দিগন্ত পেরিয়ে গেলেই ওপারে একটা পথ। স্মৃতির পথ। ইংরিজিতে যাকে বলে ডাউন মেমোরি লেন। আমি ওই পথ ধরে হেঁটে আসা কিশোরকে দেখতে পাই। শীতের সকালে সর্ষে ফুলের মাঝখানের আলপথ দিয়ে দৌড়ে স্কুলে যাচ্ছে সে । আমি দেখতে পাই বড় কচু পাতা মাথায় দিয়ে ঝুম বৃষ্টির মধ্যে হেঁটে যাচ্ছে সে। নাইনে ওঠা মেয়েটি প্রথম বার ফ্রক ছেড়ে মায়ের শাড়ি পড়ে দুরু দুরু মনে সাইকেল চালিয়ে আসছে বহুদূর থেকে। মাঝে মাঝে সাইকেলের ট্রিং ট্রিং শব্দ। টিউশন শেষে পাশাপাশি হাঁটা সাইকেল নিয়ে। হঠাৎ কখনো বা অজান্তেই আঙুলে আঙুল ছোঁয়া লেগে শিহরিত হওয়া। আমি দেখতে পাই বিকেলের শেষে দুই বন্ধু মিলে সাইকেল চালিয়ে ফার্মএর পাশের কালভারটায় বসে অপেক্ষা করছে সূর্যাস্ত দেখবে বলে। দুই বন্ধু মিলে আবিষ্কার করছে মেঘের রং কখনো সবুজ হয় না। তুচ্ছ কিছু দৃশ্যকল্প ভেসে আসছে মনন জুড়ে।
বাড়ি যাবে না ? যা বরফ পড়ছে মনে হচ্ছে এরপরে আর রাস্তায় গাড়ি ঘোড়া থাকবে না। সম্বিত ফিরল কলিগের ডাকে। এবারে বাড়ি ফেরার পালা।
—— ০ ——